কবরের আগেই যেখানে ন্যায়বিচারের মৃত্যু
মোঃ নুরুল হক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
রামিসার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল বাংলাদেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি সংবাদ নয়; এটি এক ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্রের সামনে ধরা এক নির্মম আয়না। রামিসা আজ শুধু একটি নাম নয়—সে হয়ে উঠেছে ভঙ্গুর নিরাপত্তার প্রতীক, লাঞ্ছিত নিষ্পাপতার প্রতিচ্ছবি, এবং সেই ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিরূপ যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্মান প্রতিনিয়ত অনিরাপদ হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক পচনের কাছে। যখন একটি রাষ্ট্র তার কন্যাসন্তানদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিঃশব্দে নিজের মানবিকতার বাগানকে শুকিয়ে যেতে দেয়।
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি একটি গভীরতর সামাজিক ক্যান্সারের দৃশ্যমান উপসর্গ। রামিসা আজ বাংলাদেশের প্রতিটি অসুরক্ষিত মেয়ের নাম, প্রতিটি আতঙ্কিত পিতামাতার আর্তনাদ, এবং প্রতিটি অবহেলিত বিচারপ্রার্থীর প্রতীক।
যখন আমাদের নিষ্পাপ কন্যাশিশুরা, যারা এই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাব্য জননী, ধর্ষিত ও নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়, তখন আইনশৃঙ্খলার প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য আর কোনো পরিসংখ্যানের প্রয়োজন পড়ে না। একটি সমাজের মান নির্ধারিত হয় তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, বরং তার কন্যারা কতটা নিরাপদে সেই সমাজের আকাশের নিচে চলাফেরা করতে পারে, তার মাধ্যমে।
এমন বর্বর ও পৈশাচিক ঘটনা যখনই ঘটে—আর বাস্তবে যার অল্প অংশই জনসমক্ষে আসে—তখন পুরো জাতি সাময়িক শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, টেলিভিশনের পর্দা ভরে যায় তর্ক—বিতর্কে, ক্ষমতার করিডোরে প্রতিধ্বনিত হয় বিচারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু জনস্মৃতির ক্ষত শুকানোর আগেই রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল ইচ্ছাকৃতভাবে নতুন কোনো নাটক, বিতর্ক বা বিভ্রান্তির আয়োজন করে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়।
পুরোনো ট্র্যাজেডি চাপা পড়ে নতুন প্রদর্শনীর ধুলোর নিচে, আর ভুক্তভোগীর কান্না ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। ফলে আমাদের সমাজে বিচার হয়ে উঠেছে মৌসুমি, ক্ষোভ সাময়িক, আর স্মৃতি ভয়াবহভাবে স্বল্পস্থায়ী। অপরাধীরা এই চক্রটি খুব ভালো করেই বোঝে; তারা জানে, এই দেশে মানুষের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই জনরোষের আগুন নিভে যায়।
এখন সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্ন হলো—কেন এ ধরনের বর্বরতা আমাদের সমাজে এত নিয়মিতভাবে ফিরে আসে? এটি কি রাষ্ট্রনায়কদের ব্যর্থতা? নাকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অক্ষমতা? নাকি আরও গভীরে প্রোথিত সেই নৈতিক পচন, যেখানে শিক্ষা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতা উন্নয়নের চাকচিক্যের আড়ালে নিঃশব্দে ধ্বংস হয়ে গেছে?
উত্তরটি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক নৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর পতনের বহিঃপ্রকাশ।
রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে বিদ্যমান আইন কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে। কাগজে—কলমে আইন লোহার স্তম্ভের মতো দৃঢ় দেখালেও বাস্তবে তা গলে যায় রাজনীতি, ক্ষমতা ও অর্থের উত্তাপে। আমাদের সমাজে বিচার অনেক সময় সত্যের পাল্লায় নয়, বরং অভিযুক্তের আর্থিক ও রাজনৈতিক শক্তির ওজনে নির্ধারিত হয়। তদন্ত প্রভাবিত হয়, বিচার বিলম্বিত হয়, আর দুর্বল মানুষের কান্না চাপা পড়ে ফাইল, প্রভাব ও অন্তহীন সময়ক্ষেপণের নিচে।
একইসঙ্গে আমরা এমন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হয়েছি, যারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারে। রাষ্ট্রের আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও ধীরে ধীরে তারা জড়িয়ে পড়েছে পৃষ্ঠপোষকতা, স্বজনপ্রীতি ও আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের জালে। আমরা পুলিশকে অতিরিক্ত রাজনৈতিকীকরণের মাধ্যমে পেশাদারিত্বহীন করে ফেলেছি। বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করেছি নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রভাবকে মেধা ও সততার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যের হাতিয়ারে পরিণত করে। একইসঙ্গে একটি অদৃশ্য ‘ডিপ স্টেট’—আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠীর সমন্বয়ে—রাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে উঠেছে, যা প্রায়শই সাধারণ মানুষের ইচ্ছাশক্তির চেয়েও অধিক ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো এই তিক্ত বাস্তবতাকে আরও উন্মোচিত করেছে, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের ওপর মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফলে আইন ও বিচার আর সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে না। বিচার হয়ে ওঠে নির্বাচিত, বিলম্বিত কিংবা দরকষাকষির বিষয়। অপরাধীরা শিখে যায়—অর্থ শাস্তিকে হালকা করতে পারে, রাজনৈতিক আশ্রয় অভিযোগকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে, আর প্রভাবশালী পরিচয় প্রতিষ্ঠানকে নীরব করে দিতে পারে। যখন শাস্তির নিশ্চয়তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন অপরাধ নির্ভীক হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই সংকট কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়; এটি গভীরভাবে নৈতিক ও আত্মিক সংকটও বটে। ধর্ম, যা সমাজের বিবেক হওয়ার কথা ছিল, সেটিও বহু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে—ধর্মের কারণে নয়, বরং ধর্মচর্চার প্রকৃত নৈতিক ভিত্তি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের ধর্মপ্রাণ বলে পরিচয় দিলেও সততা, সহমর্মিতা, আত্মসংযম ও জবাবদিহিতা আজ দৈনন্দিন জীবন থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। আচার টিকে আছে, কিন্তু নৈতিকতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য ধার্মিকতার প্রদর্শন আজ প্রায়ই দুর্নীতি, সহিংসতা, শোষণ ও ভণ্ডামির সঙ্গে সহাবস্থান করছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, কখনো কখনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে স্পষ্ট হয়—ধর্মীয় পোশাক পরা বা ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করলেই কেউ নৈতিক হয়ে ওঠে না। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত আত্মা যেমন রাজনৈতিক স্লোগানের আড়ালে লুকাতে পারে, তেমনি পবিত্র শব্দের আড়ালেও নিজেকে আড়াল করতে পারে। এসব অপরাধ ধর্মের ব্যর্থতা নয়; বরং মানুষের ব্যর্থতা, যারা ধর্মের ন্যায়, দয়া ও জবাবদিহিতার শিক্ষা বাস্তবে ধারণ করতে পারেনি। নৈতিকতাহীন ধর্ম হয়ে ওঠে অভিনয়, আর ন্যায়বিচারহীন ধর্ম হয়ে ওঠে ভণ্ডামি।
অতএব সমাধান কেবল স্লোগানে নয়—না ধর্মনিরপেক্ষ স্লোগানে, না ধর্মীয় স্লোগানে। সমাধান নিহিত রয়েছে নৈতিকতা ও আইনের শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠায়। একটি সমাজ তখনই টিকে থাকে, যখন আইন রাজনীতি, অর্থ ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করে, এবং নৈতিক মূল্যবোধ পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় কেন্দ্র ও জনজীবনে আন্তরিকভাবে চর্চিত হয়। উন্নত দেশগুলো কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে অপরাধ কমায়নি; তারা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে, এবং সামাজিক মর্যাদা বা সম্পদ নির্বিশেষে শাস্তির নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করেছে।
একইভাবে ধর্মও তখনই সমাজ সংস্কারের শক্তিতে পরিণত হতে পারে, যখন তা কেবল পরিচয়ের নয়, বরং ন্যায়, দয়া, মর্যাদা, সততা ও মানবিক জবাবদিহিতার শিক্ষা দেয়। যে জাতির নাগরিকেরা বিবেক হারিয়ে ফেলে, সেই জাতি কখনোই তার কন্যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। আবার যে রাষ্ট্রে অপরাধীরা জানে অর্থ ও প্রভাব দিয়ে দায়মুক্তি কেনা যায়, সেখানে কোনো নৈতিক বক্তৃতাই কার্যকর হয় না।
সুতরাং মুক্তির পথ একটিই—নৈতিক শিক্ষা, সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং আপসহীন আইনের প্রয়োগের সমন্বয়। হৃদয়ে যখন নৈতিকতা শাসন করবে এবং রাষ্ট্রে যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই এই সমাজ ধীরে ধীরে নিজেকে এই ভয়াবহ পতনের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে পারবে।
লেখক আইইউবিএটি—এর ইংরেজি বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক এবং মালয়েশিয়ার ইউপিএম—এর একজন পিএইচডি গবেষক।