গাজায় ঘুমন্ত মানুষের শরীর কামড়ে খাচ্ছে ইঁদুর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগে যুক্ত হয়েছে নতুন এক ভয়াবহ সংকট—ইঁদুরের উপদ্রব। ঘরবাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী তাবুতে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিরা এখন প্রায় প্রতি রাতেই বড় আকারের ইঁদুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
সম্প্রতি গাজা সিটির একটি তাবুতে ঘুমন্ত অবস্থায় ৬৩ বছর বয়সী ইনশিরাহ হাজ্জাজ নামের এক বৃদ্ধার পায়ের আঙুল ইঁদুরে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি টের না পেলেও সকালে গুরুতর ক্ষত দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি একটি অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকদের মতে, তার পায়ে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
গাজা উপত্যকার প্রায় ২২ লাখ মানুষের মধ্যে অন্তত ১৫ লাখ এখন জরাজীর্ণ তাবুতে বসবাস করছেন। টানা বোমাবর্ষণে অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে বাধা থাকায় ভেঙে পড়েছে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে জমে থাকা আবর্জনা ও পয়ঃবর্জ্য ইঁদুর ও পোকামাকড়ের নিরাপদ আবাসে পরিণত হয়েছে।
ভুক্তভোগী ইনশিরাহ হাজ্জাজ জানান, তাদের তাবুর চারপাশ ধ্বংসস্তূপ ও ময়লায় ভরা। প্রতিদিন শত শত ইঁদুর সেখানে ঘোরাফেরা করে। তিনি বলেন, জীবনে কখনো ভাবেননি ইঁদুর তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করবে। আতঙ্কে এখন স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতেও পারছেন না তিনি।
এই ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। উত্তর-পশ্চিম গাজা সিটির আল-মাকুসি এলাকায় মাত্র ২৮ দিন বয়সী নবজাতক আদাম আল-উস্তাজের মুখে ইঁদুর কামড়ে গুরুতর জখম করেছে। শিশুটির বাবা ইউসেফ আল-উস্তাজ জানান, গভীর রাতে সন্তানের কান্নায় ঘুম ভেঙে গেলে মোবাইলের আলোয় তিনি দেখতে পান শিশুটির মুখ রক্তাক্ত।
দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তার গালে গভীর ক্ষত শনাক্ত করেন। বর্তমানে গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে ইঁদুরের কামড়ে আহত অসংখ্য শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
গাজা পৌর কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন হাজার হাজার অভিযোগ পেলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরো গাজা সিটিজুড়ে জমে থাকা বিপুল ধ্বংসস্তূপ ও কঠিন বর্জ্যই ইঁদুরের বংশবৃদ্ধির প্রধান কারণ।
অবরোধ পরিস্থিতির কারণে ইঁদুর দমনের বিষ, জ্বালানি ও ভারী যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানিয়েছে, দ্রুত কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সংস্থাটি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, অনিয়ন্ত্রিত ইঁদুরের উপদ্রব থেকে বড় ধরনের মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এদিকে গাজাজুড়ে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় ইউসেফ আল-উস্তাজের মতো অসংখ্য অভিভাবক চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, অবকাঠামো সংস্কার ও আবর্জনা অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত এই ভয়াবহ ইঁদুর আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে না।