কপ–৩০ শেষে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো রয়েই গেল

নিজস্ব প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২২ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের বেলেম শহরে কপ-৩০ শেষ হয়েছে আনুষ্ঠানিকতা আর প্রতিশ্রুতির ভিড়ে। সম্মেলন শেষে উন্নত বিশ্ব সন্তুষ্ট, কারণ তারা আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার দাবি করতে পারছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য প্রশ্নটা এখনো অনুচ্চারিত রয়ে গেছে। এই সম্মেলন আমাদের বাস্তব সংকটের কতটুকু সমাধান দিতে পারল?

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা না। এটি বাংলাদেশের জন্য চলমান বাস্তবতা। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় সব মিলিয়ে ক্ষয় হচ্ছে জীবিকা, ভাঙছে সামাজিক কাঠামো। এই বাস্তবতায় কপ সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জায়গা হওয়ার কথা ছিল ক্ষতিপূরণ। কিন্তু কপ–৩০ সেই প্রশ্নে স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

ক্ষতিপূরণ নয়, সহানুভূতির রাজনীতি
জলবায়ু পরিবর্তনের দায় মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর বর্তায়। ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণের বড় অংশ তাদের হাত ধরেই হয়েছে। সেই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি নৈতিক ও আইনি দুটো দিক থেকেই ক্ষতিপূরণ হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে উন্নত দেশগুলো এই অর্থকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে নয়, বরং সহানুভূতিমূলক সহায়তা হিসেবে উপস্থাপন করছে। শব্দের এই পার্থক্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিপূরণ মানে দায় স্বীকার। আর সহায়তা মানে দয়ার অবস্থান থেকে দেওয়া। কপ-৩০–এর সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, উন্নত দেশগুলো এখনো দায় স্বীকারের জায়গায় যেতে প্রস্তুত নয়।

এবারের সম্মেলনে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অভিযোজন খাতে অর্থায়ন বাড়ানো হবে। কিন্তু এই ঘোষণার সঙ্গে কোনো বাধ্যতামূলক কাঠামো যুক্ত হয়নি। কে দেবে, কত দেবে, কবে দেবে এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। এর আগের সম্মেলনগুলোতে ২০৩০ সালকে লক্ষ্য ধরে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিও পূরণ হয়নি। বরং সময় বাড়িয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই স্পষ্ট হয়েছে। জলবায়ু অর্থায়ন ক্রমেই এমন এক জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু দায় নেই।

নতুন অর্থ নয়, পুরোনো টাকার পুনর্বিন্যাস
উন্নত দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়নের নামে যে অর্থ দিচ্ছে, তার বড় অংশই আসছে বিদ্যমান উন্নয়ন সহায়তা থেকে। অর্থাৎ দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য বা শিক্ষার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ থাকার কথা, সেটিকেই নতুন মোড়কে জলবায়ু তহবিল হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

ওইসিডির তথ্য বলছে, গত এক দশকে উন্নয়ন সহায়তার ভেতরে জলবায়ু খাতে ব্যয়ের হার দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু মোট সহায়তার পরিমাণ সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো একদিকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার অর্থ পাচ্ছে না, অন্যদিকে সামাজিক খাতগুলোতেও অর্থ সংকট তৈরি হচ্ছে। এই অর্থ কোনোভাবেই ‘নতুন ও বাড়তি’ নয়। অথচ জলবায়ু ক্ষতিপূরণের মূল শর্তই ছিল-এটি অতিরিক্ত অর্থ হবে।

কপ-৩০–এ আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে অভিযোজনের চেয়ে প্রশমন এখনো উন্নত দেশগুলোর অগ্রাধিকার। প্রশমন প্রকল্পের সুফল বৈশ্বিক। কার্বন নিঃসরণ কমলে উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরাও উপকৃত হয়। অন্যদিকে অভিযোজন প্রকল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও জীবিকাকে রক্ষা করে। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিযোজনই বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অভিযোজন খাতে অর্থায়ন তুলনামূলকভাবে কম। এমনকি অভিযোজন অগ্রগতির সূচক নির্ধারণের প্রস্তাবেও উন্নত দেশগুলো অনাগ্রহ দেখিয়েছে। কারণ, সূচক মানেই জবাবদিহি। আর জবাবদিহিই তারা এড়িয়ে যেতে চায়।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু রাজনীতিতে নৈতিকতার কথা বলা হয় অনেক। কিন্তু সিদ্ধান্তের জায়গায় অর্থনৈতিক স্বার্থই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পায়। উন্নত দেশগুলো নিজেদের প্রবৃদ্ধি, শিল্প ও ভোক্তা জীবনের ওপর কোনো চাপ নিতে চায় না।
এই বাস্তবতায় প্যারিস চুক্তি বা ইউএনএফসিসির কাঠামো নৈতিক আবেদন তৈরি করতে পারলেও কার্যকর চাপ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। জলবায়ু ন্যায্যতা তাই এখনো মূলত ভাষণ ও ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

কপ প্রক্রিয়া বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু এটিকে একমাত্র ভরসা করে বসে থাকাও বিপজ্জনক। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এখন প্রয়োজন

(১) ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শক্তিশালী জোট
(২) ক্ষতিপূরণের আইনি ভিত্তি জোরালো করা
(৩) উন্নয়ন সহায়তা ও জলবায়ু অর্থায়নের স্পষ্ট বিভাজন দাবি করা

নইলে এই সম্মেলনগুলো শুধু বছরের পর বছর চলতেই থাকবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন বাস্তব সংকটে আটকে থাকবে।

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য কোনো কূটনৈতিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আমাদের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। এই সত্য যত দিন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে না আসবে, তত দিন কপ সম্মেলনের ফলাফল আমাদের কাছে কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

মোঃ ফরিদুল ইসলাম
কোষাধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম জেলা লজিক ইয়ুথ প্লাটফর্ম।

প্রধান সম্পাদক: মো. নূরুল হক

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: আজরত পাড়া, মহাখালী, ঢাকা ১২১২।

ইমেইল: mofossolsangbad@gmail.com

মোবাইল: 01626605495