এলপিজি আমদানি কমে সংকট তীব্র, দ্বিগুণ দামেও মিলছে না সিলিন্ডার
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৬ এএম
দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)–এর চাহিদা প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশের বেশি হারে বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে আমদানিতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় দেশে এলপিজি আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। এর ফলে বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, যার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বিইআরসির তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয় ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। পরের বছর ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ১০ হাজার টনে। কিন্তু পরবর্তী বছরে আমদানি কমে নেমে আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম। বিশেষ করে বছরের শেষ তিন মাসে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বাজারে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
নিয়ম অনুযায়ী, বছর শেষে যে পরিমাণ এলপিজি মজুত থাকার কথা ছিল, তা আগেই বাজারে বিক্রি হয়ে গেছে। এরপরও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা, আবার অনেক এলাকায় সিলিন্ডার একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে ৫২টি কোম্পানির। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব সিলিন্ডার ভরার প্ল্যান্ট থাকলেও আমদানির সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরে কোনো না কোনো সময়ে আমদানি করেছে ১৭টি কোম্পানি, তবে সারা বছর নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। বছরের শুরুতে কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি করলেও শেষ দিকে অনেকেই আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রাখে।
বিইআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মাসভিত্তিক আমদানির তথ্য সরকারের কাছে আগেই ছিল। নিয়মিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময়মতো আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হলে এই সংকট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, চলমান এলপিজি সংকট মূলত সরবরাহজনিত। আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা, ইরান থেকে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চীনের মতো বড় ক্রেতাদের বৈশ্বিক বাজারে সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণে এলপিজি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব কারণে আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে।
তবে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সংকটের জন্য নীতিগত জটিলতা ও সরকারি অনুমোদনের দেরিকে দায়ী করছে। সংগঠনটির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, এক বছর আগেই আমদানি বাড়ানোর অনুমোদন চাওয়া হলেও তা সময়মতো দেওয়া হয়নি। নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের আবেদনও অনুমোদন না পাওয়ায় বাজারে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
এলপিজি সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে যে অল্পসংখ্যক সিলিন্ডার আসে, তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
গ্যাস না পেয়ে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ–চালিত চুলা কিংবা কেরোসিনের চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। এতে একদিকে রান্নার খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বিইআরসি জানিয়েছে, এলপিজি আমদানি বাড়াতে জ্বালানি বিভাগ এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আমদানির অনুমতিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা নতুন করে আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্টদের আশা, আমদানি বাড়লে ধীরে ধীরে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং ভোক্তাদের দুর্ভোগ কমে আসবে।
মো: মনিরুল ইসলাম
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর