ফ্রিল্যান্সিংয়ে নতুন সম্ভাবনা, রেমিট্যান্সে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল শ্রম
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম
প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং। ঘরে বসে বৈশ্বিক বাজারে সেবা রপ্তানির মাধ্যমে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় দেশে আনছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেওয়া গেলে আগামী কয়েক বছরে ফ্রিল্যান্সিং রেমিট্যান্স আয়ের একটি টেকসই উৎস হিসেবে আরও গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে প্রায় ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২২–২৩ সালে এ খাত থেকে আয় ছিল প্রায় ৪৬ কোটি ডলার, আর ২০২১–২২ অর্থবছরে আসে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা ওঠানামার মধ্যেও ফ্রিল্যান্সিং থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ধারা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএফএবি) জানায়, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ মানুষ ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম আপওয়ার্কে নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার। নিবন্ধনের বাইরে থাকা ফ্রিল্যান্সারদের আয় যুক্ত করলে প্রতিবছর এ খাত থেকে মোট আয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায় বলে দাবি সংগঠনটির।
বিএফএবির তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ ফ্রিল্যান্সার কাজ করেন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিং খাতে। তবে ধীরে ধীরে মেডিকেল কনটেন্ট রাইটিং, অ্যাকাউন্টিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক সেবার চাহিদাও বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সার সরবরাহকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষ কয়েকটির মধ্যে রয়েছে। তবে আয়ের দিক থেকে এই বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফ্রিল্যান্সিং মূলত পরিষেবা রপ্তানি (Service Export)। এতে বড় শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো বিনিয়োগ ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব। পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরি হয় দেশের ভেতরেই, যা বেকারত্ব কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও বিকল্প ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের আয় দেশে আনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার চেষ্টা চলছে, যাতে এই খাতের আয় ধীরে ধীরে বেশি পরিমাণে বৈধ চ্যানেলে আসে।
জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেমের সীমিত সুবিধা, মানসম্মত ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চাপ ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে ফ্রিল্যান্সিংভিত্তিক দক্ষতা যুক্ত করা, বিষয়ভিত্তিক (নিশ) প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ এবং তরুণদের ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে পারলে এই খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বৈদেশিক মুদ্রা আয় নিশ্চিত করা সম্ভব।
সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরিফুজ্জামান আকাশ
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর