বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট: ব্যক্তিপূজা থেকে নাগরিক ক্ষমতায়নের পথে বাধা
মফস্বল সংবাদ ডেস্কক
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও রক্ত আছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যেকোনো বড় অর্জন বা আন্দোলনে জনগণের অবদানকে আড়াল করে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারকে দেওয়ার এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
১. কৃতিত্বের সংকীর্ণ রাজনীতি ও ব্যক্তিপূজা
বাংলাদেশের প্রধান দলগুলোর মধ্যে কৃতিত্বের একচেটিয়া দাবি করার প্রবণতা প্রবল। আওয়ামী লীগ যেমন স্বাধীনতাকে নির্দিষ্ট এক দল/ব্যক্তিকেন্দ্রিক করেছে, তেমনি বিএনপিও 'স্বাধীনতার ঘোষক' হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমানকে নিয়েই ব্যবসা করে। এমনকি জুলাই আন্দোলনের সাফল্যের পর জামায়াত বা এনসিপির আন্দোলনের মালিকানা দাবি করার এক ধরণের 'পারিবারিক বা দলীয় সম্পত্তি' ভাব লক্ষ্য করা যায়। এখানেই বাদ যাচ্ছে সেই সাধারণ মানুষ, যারা গুলির মুখে বুক পেতে দিয়েছিল।
২. রাজতন্ত্র বনাম পরিবারতন্ত্রের আধিপত্য
বাংলাদেশের রাজনীতি রাজতন্ত্রের ছায়ায় পরিবার তান্ত্রিক ও ব্যক্তি তান্ত্রিক হয়ে গেছে। এখানে দল এমনকি জনগণের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা ব্যক্তি মুখ্য হয়ে ওঠে। সাধারণ কর্মী বা জনগণের মতামতের চেয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। এটি গণতান্ত্রিক চর্চাকে সমূলে বিনাশ করছে।
৩. অসহিষ্ণুতা ও "মালিকানা" মানসিকতা
এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দেশের 'মালিক' মনে করে। ফলে ক্ষমতা হারালে তারা মনে করে তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই হিংসা ও অসহিষ্ণুতাই রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এখানে অনুপস্থিত; বরং কেউ দলের সমালোচনা করলে তাকে দমনের জন্য 'বট বাহিনী' বা ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে দেওয়া হয়।
৪. জুলাই আন্দোলনের পরেও অমীমাংসিত প্রশ্ন
জুলাই বিপ্লব আমাদের নতুন স্বপ্ন দেখালেও, মানসিকতার পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এখনো দল বা নেতার ঊর্ধ্বে উঠতে না পারার প্রবণতা রয়ে গেছে। নেতার আগমনে রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা কিংবা সাধারণ মানুষের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে বড় করে দেখার সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান।
সমাধানের পথ: আইনের শাসন ও সমঅধিকার-
এই গভীর সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমূল সংস্কার প্রয়োজন:
আইনের চোখে সাম্য: দলীয় প্রধান থেকে শুরু করে একজন সাধারণ শ্রমিক প্রত্যেকেই যেন রাষ্ট্রের কাছে সমান আইনি সুরক্ষা ও সুযোগ পান। কোনো বিশেষ পদের জন্য বাড়তি সুবিধা বা ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ব্যক্তিপূজার অবসান,ইতিহাসকে তার আপন গতিতে চলতে দিতে হবে। কোনো আন্দোলন বা অর্জনকে নির্দিষ্ট পরিবার বা দলের ফ্রেম থেকে বের করে এনে জনগণের অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
সহিষ্ণুতা ও জবাবদিহি: রাজনীতিতে ভিন্নমতকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা এবং ডিজিটাল বা শারীরিক কোনোভাবেই যেন ভিন্নমতকে 'সাইজ' করার সংস্কৃতি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
নাগরিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্র বা দেশ কোনো দলের বা ব্যক্তির নয়, বরং জনগণের- এই চেতনাকে সংবিধানে এবং প্রাত্যহিক রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বারবার রক্ত দিয়ে তাদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছে। এখন সময় এসেছে এমন এক বাংলাদেশ গড়ার, যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের সেবার জন্য, কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষমতা জাহির করার জন্য নয়। জুলাই বিপ্লবের চেতনা তখনই সার্থক হবে, যখন জনগণই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার।
লেখক: খালিদ ইসলাম
রংপুর মেডিকেল কলেজ, রংপুর।