বৈষম্যের শেকলে বন্দি কোদালকাটির চার অন্ধের জীবন: উন্নয়নের আলো কি তাদের ঘরে পৌঁছাবে?
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:৫৪ পিএম
আমরা গর্ব করি—দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়ন ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রাম। শহরে গড়ে উঠছে উঁচু অট্টালিকা, রাস্তায় ঝলমলে আলো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ছুটছে হাইওয়েতে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন রিপোর্টে প্রতিদিনই উঠে আসে সাফল্যের গল্প—ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহারের হার বেড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়নের যাত্রা কি সত্যিই সবার জন্য? আলো কি জ্বলে উঠছে প্রত্যেক ঘরে, নাকি কেবল শহরের বিলবোর্ডে ঝলমল করছে? সেই প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল—“কেউ পিছিয়ে থাকবে না”?
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে এক অদৃশ্য কারাগার। আজাহার আলীর পরিবার যেন সমাজের প্রান্তে ছিটকে পড়া এক নির্যাতিত, অবহেলিত অধ্যায়। একই পরিবারের চার সদস্য জন্ম থেকে অন্ধ ও বাকপ্রতিবন্ধী। দিনের আলো তারা দেখতে পায় না, কারও সঙ্গে কথাও বলতে পারে না। খাওয়া-না-খাওয়ার অনিশ্চয়তায় দিন গড়িয়ে যায়। অসুখ-বিসুখ হলে একমাত্র ভরসা আল্লাহর নাম। রাষ্ট্রের হাসপাতাল, জনপ্রতিনিধির খোঁজখবর কিংবা এনজিওর সাহায্য—সবই তাদের জন্য মরীচিকা।
তাদের ঘরে একমাত্র পানির উৎস হলো একটি ভাঙা টিউবওয়েল। লোহার হ্যান্ডেল ভেঙে সেখানে কাঠের হ্যান্ডেল লাগানো হয়েছে। পানির প্রতিটি ফোঁটার জন্য তাদের সংগ্রাম করতে হয়। টয়লেটের অবস্থা আরও করুণ—অস্বাস্থ্যকর এবং অমানবিক। অথচ সরকারি কিংবা বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ল্যাট্রিন ও নতুন টিউবওয়েল পাওয়ার দাবিদার তারাই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এসব সুযোগ-সুবিধা কেবল জনপ্রতিনিধি বা এনজিও কর্মীদের স্বজনদের ঘরে পৌঁছায়। সেখানে বসানো হয় নতুন টিউবওয়েল, দেওয়া হয় ল্যাট্রিন। ছবি তুলে প্রচারণা চলে, রিপোর্ট লেখা হয়, আর আজাহার আলীর পরিবারের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—উন্নয়নও কি বৈষম্যের শিকার? ধনীর ঘরে আলো, গরিবের ঘরে অন্ধকার—এ কোন সভ্যতা? রাষ্ট্র কি কেবল ধনীদের জন্য? জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব কি কেবল ভোটের মৌসুমে সীমাবদ্ধ? মানুষ কি কেবল ভোটার তালিকার সংখ্যা, নাকি আসলেই মানুষ?
আজাহার আলীর পরিবারের দিকে তাকালে মনে হয়—যদি রাষ্ট্র তাদের না দেখে, তবে রাষ্ট্রের চোখই অন্ধ। যদি সমাজ তাদের দুর্দশায় নীরব থাকে, তবে সেই সমাজ মৃত। চারজন অন্ধ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষ অন্ধকারে বেঁচে আছে, অথচ আমরা প্রতিদিন উন্নয়নের গর্বে বুক ফুলাই।
তাদের কান্না যদি আমরা শুনতে না পাই, তবে কান থাকলেও আমরা বধির। তাদের অন্ধকার যদি আমরা দেখতে না পাই, তবে চোখ থাকলেও আমরা অন্ধ।
আজাহার আলীর পরিবারের এই গল্প শুধু একটি গ্রামের চিত্র নয়, এটি বৈষম্য, অবহেলা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
আমি সমাজকে বলি—তাদের দিকে তাকাও। আমি রাষ্ট্রকে বলি—তাদের দায়িত্ব নাও। আমি জনপ্রতিনিধিকে বলি—কাজে প্রমাণ দাও, কথায় নয়।
আজাহার আলীর পরিবারের অন্ধকার যেন আমাদের লজ্জা হয়ে থাকে। তাদের নিঃশব্দ কান্না যেন আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা—সবই মানুষের জন্য। আর যদি মানুষকেই বাদ দেওয়া হয়, তবে সেই রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা কেবল ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।