দুই মাসেই ধসে পড়ল ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেড়িবাঁধ
মফস্বল সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
বরগুনা সদর উপজেলার পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনের জন্য বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অর্থায়নে নির্মিত রিং বেড়িবাঁধ মাত্র দুই মাসের মধ্যেই ধসে পড়েছে। ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বাঁধের গাইডওয়ালও পাশের খালে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে যথাযথ তদারকি না থাকা এবং ব্যাপক অনিয়মের কারণেই এত দ্রুত বাঁধটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
কাজ বাস্তবায়নে সহযোগী সংস্থা হিসেবে ছিল স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘জাগোনারী’। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে নির্ধারিত কোনো নিয়মই মানা হয়নি। শর্ত অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণে ৪০ শতাংশ মাটি দূর থেকে পরিবহন করে আনার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা না করে বাঁধের পাশের খাল খনন করে সেই মাটি দিয়েই বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এতে বাঁধের পাশের অংশ দুর্বল হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই গাইডওয়ালসহ খালে ধসে পড়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পটিতে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৬২৮ মিটার বাঁধ নির্মাণ করে কাজ শেষ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও শঙ্কা
পোটকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ বাবুল খান বলেন, "বাঁধের পাশের খাল খনন করে সেই মাটি দিয়েই বাঁধ বানানো হয়েছে। গোড়া দুর্বল থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই বাঁধ ও গাইডওয়াল খালে ধসে পড়েছে।"
উন্নয়ন সংস্থা জাগোনারীর তদারকি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা খালেক হাওলাদার বলেন, "জাগোনারী সঠিকভাবে তদারকি না করায় কাজের গুণগত মান এত খারাপ হয়েছে। দুই মাসের মধ্যেই যদি ভাঙন দেখা দেয়, তবে এই কাজের দায় তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।"
আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক বলেন, "দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ থেকে এলাকার মানুষ কতটা সুফল পাবে, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। সামনে বাঁধটির অস্তিত্ব আদৌ থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ কাজ করছে।"
কাজের তদারকি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন খোদ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি জানান, কাজের তদারকির জন্য এলজিইডির সদর উপজেলা প্রকৌশলী, পিআইও এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নিয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু জাগোনারী নামমাত্রভাবে কমিটিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে; বাস্তবে তদারকির জন্য তাদের কখনোই ডাকা হয়নি।
তবে নিজেদের দায় অস্বীকার করেছেন জাগোনারীর প্রধান নির্বাহী হোসনে-আরা হাসি। তিনি বলেন, "আমি শুধু অর্থপ্রাপ্তির মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছি। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আমাদের মাধ্যমে অর্থ দিয়েছে, তবে কাজটি বাস্তবায়ন করেছে ঢলুয়া ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি।"
অন্যদিকে ঢলুয়া ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "কাজের তদারকি থেকে শুরু করে সবকিছুই জাগোনারীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। আমরা শুধু কাজ শেষে ঠিকাদারের অর্থ ছাড় করেছি।"
কাজে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মো. মিল্টন বলেন, "নকশায় ত্রুটি থাকার কারণেই মূলত বাঁধ ধসে পড়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলে ধসে পড়া অংশ মেরামত করে দেওয়া হবে।"
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহ আজিজ বলেন, "বেড়িবাঁধ ধসে পড়ার বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। নির্মাণকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"