ইসরায়েলি বোমা থেকে বাঁচলেও অজানা ভাইরাসে প্রাণ হারাচ্ছেন গাজার মানুষ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩০ এএম
ইসরায়েলি হামলা থেকে প্রাণে বাঁচলেও অজানা ভাইরাসে একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে ফিলিস্তিনের গাজায়। দীর্ঘ যুদ্ধ, অবরোধ ও চিকিৎসা সংকটে সেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে সাধারণ সর্দি-জ্বরও এখন অনেকের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক এমনই একটি ঘটনার কথা। গাজাবাসী মারওয়া কালুব ফ্লুয়ের উপসর্গ নিয়ে তাঁর আট বছরের মেয়ে মরিয়মকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। সাধারণ চিকিৎসা শেষে মেয়েকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরবেন—এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফিরতে হয়েছে সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে।
৩৮ বছর বয়সী মারওয়া বিশ্বাস করেছিলেন, মেয়ের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও সাধারণ ওষুধেই সে সেরে উঠবে। বাস্তবে তা হয়নি। দীর্ঘ যুদ্ধ, অনাহার ও চিকিৎসা সেবার ভয়াবহ সংকটে বিপর্যস্ত গাজায় একটি সাধারণ অসুস্থতাই কেড়ে নিয়েছে একটি শিশুর প্রাণ।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গাজার স্বাস্থ্যখাত কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। যদিও গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবে হামলা ও অবরোধ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ত্রাণ প্রবেশে বাধার কারণে মাসের পর মাস অপুষ্টিতে ভুগছে সাধারণ মানুষ। এতে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
মরিয়মের খালা ইমান কালুব জানান, শিশুটির আগে কোনো জটিল রোগ ছিল না। মৃত্যুর আগে তার তীব্র কাশি, বমি ও উচ্চ জ্বর দেখা দেয়। ধীরে ধীরে সে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরিবার ভেবেছিল, ভাইরাসজনিত অসুখ—সময় দিলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক সপ্তাহ ধরে গাজাজুড়ে একটি রূপান্তরিত ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা এখনো শনাক্ত করতে পারেনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। সীমিত পরীক্ষার ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চরম সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
১১ জানুয়ারি মরিয়মকে গাজার রানতিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একসময় কিডনি ও ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এটি ছিল প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র। তবে ধারাবাহিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন সেখানে মূলত শ্বাসনালি ও অন্ত্রজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ইমান কালুব বলেন, হাসপাতালে অসুস্থ শিশুর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের দেখা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, মরিয়মের ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কার্যকর চিকিৎসা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তখন আর ছিল না।
তিনি জানান, শিশুটিকে শুধু অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। স্যালাইন দেওয়ার সুযোগও ছিল না। পরিবারের ধারণা, তখনই চিকিৎসকেরা বুঝে গিয়েছিলেন—মরিয়মকে আর বাঁচানো যাবে না।
গাজার বর্তমান বাস্তবতায় মরিয়মের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অবরোধ, অনাহার ও ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে প্রতিদিনই সাধারণ রোগে প্রাণ হারাচ্ছে শিশু ও বেসামরিক মানুষ।