প্রধান শিক্ষকের ঘুষ-জালিয়াতির ফাঁদে সহকারী শিক্ষিকার বেতন বঞ্চনার অভিযোগ
মফস্বল সংবাদ ডেস্কক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (সমাজ বিজ্ঞান) শাহনাজ পারভীন দীর্ঘদিন ধরে এরিয়ার বেতন–ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিয়োগকালীন সময়ে বৈধ পদে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেনের অনিয়ম ও ঘুষ-জালিয়াতির কারণে তিনি এ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষক শাহনাজ পারভীন জানান, তিনি ২০০২ সালে সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এমপিওভুক্ত হন। বিদ্যালয়ের ১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী তিনজন সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক পদ ছিলো। সেই মোতাবেক মো. আলী আকবর, মো. আব্দুল করিম ও শাহনাজ পারভীনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালের নতুন জনবল কাঠামো (যা ২০১২ সালে কার্যকর হয়) অনুযায়ী বাংলা, ইংরেজি ও সমাজ বিজ্ঞানে একজন করে শিক্ষক রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির ২০১৩ সালের বৈঠকে আলী আকবরকে বাংলা, আব্দুল করিমকে ইংরেজি ও শাহনাজ পারভীনকে সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক পদে এককভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন ভুয়া মিটিং দেখিয়ে পুনরায় আব্দুল করিমকে সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে পদায়ন করেন। যা আদালতের ২৪/২০১৪ মামলার রায়ের পরিপন্থী। এ ঘটনায় শাহনাজ পারভীন একাধিকবার মামলা দায়ের করেন এবং আদালত তাকে বৈধ সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
২০১৯ সালে এমপিওভুক্তির পর প্রধান শিক্ষক একযোগে শাহনাজ পারভীন ও আব্দুল করিমের নাম সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে বিলের আবেদন পাঠান। বিষয়টি জেলা শিক্ষা অফিসার ও রংপুরের উপপরিচালক বাতিল করে দিয়ে নির্দেশ দেন— শাহনাজ পারভীনের বেতন সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে এবং আব্দুল করিমের বেতন ইংরেজি বিষয়ে প্রদান করতে। মহাপরিচালক (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর) প্রধান শিক্ষকের অনিয়মের কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তার তিন মাসের বেতন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এরিয়ার বিল পাঠানোর জন্য প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন। টাকা নেওয়ার পরও তার আবেদন বাতিল করে কেবল আব্দুল করিমের ফাইল পাঠানো হয়। ফলে আব্দুল করিম এরিয়ার বিল পেলেও শাহনাজ পারভীন তা এখনো পাননি। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক উল্টো তিন মাসের সমপরিমাণ বেতনের টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ বাণিজ্য নিয়েও আগে থেকেই প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একটি কলরেকর্ডে আব্দুল করিম স্বীকার করেছেন যে, তিনি ও শাহনাজ পারভীনের কাছ থেকে প্রধান শিক্ষক ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন।
শাহনাজ পারভীন অভিযোগ করে বলেন, “আমি বৈধভাবে সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক হলেও দীর্ঘদিন বেতন পাইনি। উল্টো প্রধান শিক্ষক আমাকে হয়রানি করছেন। আমার প্রাপ্য বেতন–ভাতা দ্রুত প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।”
শংকর মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তিন মাসের বেতন আটকে দেওয়া হয়েছে। আসলে প্রতিষ্ঠান সভাপতি হুমায়ুন কবির ছক্কুর দায় আমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। সেই অভিযোগের কারণেই আমার বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকি বেতন তুলে দিতে ওই সহকারী শিক্ষিকার সঙ্গে তিনশো টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিও করা হয়। তারা যদি আমার তিন মাসের বেতন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, আমি সঙ্গে সঙ্গেই ফাইল পাঠাব। তবে পরে বলতে শুরু করেন, আমি ফাইল পাঠালেও শিক্ষা অফিস সেটি আটকে দেয়।”
শাহনাজ পারভীনের স্বামী আব্দুস সাত্তার বলেন, “প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন ইচ্ছাকৃতভাবে আমার স্ত্রীর এরিয়ার বিল পাঠাতে তালবাহানা করছিলেন। পরে তার সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। শর্ত ছিল— যদি তিনি এরিয়ার বিলের ফরওয়ার্ডিং পাঠান, তবে আমি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ প্রত্যাহার করব এবং ইংরেজি শিক্ষক আব্দুল করিমের সঙ্গে মিলে তার দাবিকৃত তিন মাসের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করব। কিন্তু আমার স্ত্রী অভিযোগ প্রত্যাহার করার পরেও উপপরিচালকের চিঠিতে স্পষ্ট জানানো হয় যে, প্রধান শিক্ষকের দাবিকৃত বেতন পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই। তবুও প্রধান শিক্ষক একতরফাভাবে প্রথমে পাঁচজন এবং পরে সাতজন সাক্ষীর নাম লিখে দেন। অথচ ওই চুক্তির বৈঠকে কোনো সাক্ষী ছিল না এবং এসব নাম যুক্ত করা হয় আমাদের অনুপস্থিতিতেই। এ ধরনের পদক্ষেপ স্পষ্টত জালিয়াতির শামিল।”
অন্যদিকে মুঠোফোনে একাডেমি সুপারভাইজার গোলাম কিবরিয়া বলেন, “প্রধান শিক্ষক ফাইল পাঠালে যাচাই-বাছাই করে সবকিছু ঠিক থাকলে সেটি জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”