সূর্যের বুকে বিস্ফোরণ: প্রলয়ঙ্করী সৌরঝড়ের ঝুঁকিতে বিশ্ব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
সূর্যের বুকে শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিস্ফোরণের পর সূর্যের পৃষ্ঠে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল এক গহ্বর, আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহাকাশ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে পৃথিবীমুখী সক্রিয় সানস্পট অঞ্চল ‘এআর৪৪৩৬’ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।
বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্য থেকে ছড়িয়ে পড়া চার্জযুক্ত সৌর পদার্থ পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও তাৎক্ষণিক বড় ধরনের সৌরঝড়ের সম্ভাবনা কম, তবে আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, গত ১০ মে ইউটিসি সময় ১৩টা ৩৯ মিনিটে, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৯ মিনিটে সূর্যের ‘এআর৪৪৩৬’ সানস্পট অঞ্চল থেকে শক্তিশালী এম৫.৭ শ্রেণির সৌর বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডলে বড় ধরনের গহ্বর তৈরি হয়। নাসা-র সোলার ডাইনামিকস অবজারভেটরি ধারণ করা অতিবেগুনি চিত্রে সেই গহ্বর স্পষ্ট দেখা গেছে।
বিস্ফোরণের সময় মহাকাশে ছিটকে যায় করোনাল মাস ইজেকশন বা সিএমই নামে পরিচিত চৌম্বকীয় সৌর প্লাজমার বিশাল মেঘ। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, এটি অল্পের জন্য পৃথিবীকে এড়িয়ে যেতে পারে। তবে ১৩ মে পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সামান্য ভূ-চৌম্বকীয় প্রভাব দেখা দিতে পারে।
সোলার অ্যান্ড হেলিওস্ফেরিক অবজারভেটরির তথ্যভিত্তিক মডেল অনুযায়ী, সিএমইয়ের মূল অংশ পৃথিবীর পাশ কাটিয়ে যাবে। তবুও বিস্ফোরণের ফলে তৈরি চার্জযুক্ত আন্তঃগ্রহীয় গ্যাসের তরঙ্গ পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রকে স্পর্শ করতে পারে। এতে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি ভূ-চৌম্বকীয় অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বড় ধরনের ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের আশঙ্কা কম হলেও পৃথিবীর দিকে ঘুরে আসা ‘এআর৪৪৩৬’ ভবিষ্যতে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভাষায়, এমন সক্রিয় অঞ্চলগুলোর ওপর সবসময় সতর্ক নজর রাখা হয়, কারণ পরবর্তী বিস্ফোরণ সরাসরি পৃথিবীর দিকে আঘাত হানতে পারে।
উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, গত সপ্তাহে সূর্যের উল্টো পাশে অবস্থান করেও ‘এআর৪৪৩৬’ অন্তত পাঁচটি উল্লেখযোগ্য সিএমই তৈরি করেছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে, অঞ্চলটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও জটিল চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য বহন করছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনে সূর্যের ঘূর্ণনের কারণে এই সক্রিয় অঞ্চলটি পৃথিবীর আরও সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসবে। ফলে পৃথিবীমুখী সৌর বিস্ফোরণ ও সিএমইয়ের ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে।
মূলত সৌর বিস্ফোরণ বা সোলার ফ্লেয়ার হলো সূর্যের চৌম্বকীয় শক্তির আকস্মিক নিঃসরণ থেকে তৈরি তীব্র তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ। অন্যদিকে সিএমই তুলনামূলক ধীরগতির হলেও এর প্রভাব অনেক বেশি। এগুলো পৃথিবীর দিকে এলে উপগ্রহ, রেডিও যোগাযোগ, জিপিএস ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
বর্তমানে সূর্য ‘সোলার সাইকেল ২৫’-এর সবচেয়ে সক্রিয় পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এ সময় সূর্যে চৌম্বকীয় তৎপরতা ও বিস্ফোরণের ঘটনা বেড়ে যায়। গত এক বছরে একাধিক শক্তিশালী সৌরঝড়ের কারণে পৃথিবীর নিচু অক্ষাংশেও অরোরা দেখা গেছে এবং কিছু সময়ের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
এখন বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ আবহাওয়া সংস্থা ‘এআর৪৪৩৬’ অঞ্চলটির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই সানস্পট একইভাবে সক্রিয় থাকলে শিগগিরই পৃথিবী আরও শক্তিশালী সৌরঝড়ের সরাসরি আঘাতের মুখে পড়তে পারে।