ডিসি অফিসের ঘুসের ফাঁদে সাহাবুদ্দিনের মৃত্যু

মফস্বল সংবাদ ডেস্কক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৪৭ এএম

ছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিতে গিয়ে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অফিসের ঘুসচক্রের ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারালেন বয়োবৃদ্ধ সাহাবুদ্দিন গাজী (৭৫)। জমি অধিগ্রহণের ৮ কোটি টাকার চেক ছাড় করতে গিয়ে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক ১ কোটি টাকা ঘুস নেওয়া হয়। ঘুস-হয়রানির মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে মারা যান। ঘটনাটি ঘটেছে নরসিংদী জেলায়।

সাহাবুদ্দিনের পরিবারের এক নিকটাত্মীয় বলেন, “তারা সাহাবুদ্দিনকে বাঁচতে দিল না। ডাকাতি স্টাইলে ঘুস নিয়েছে চক্রটি।” এ ঘটনায় ভয়ে এখনো ভুক্তভোগী পরিবার মুখ খুলতে পারছে না।

ঘুস লেনদেনের প্রমাণ:
দৈনিক যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিসি অফিসের দালালচক্র ৬০ লাখ টাকা চেকের মাধ্যমে এবং ৪০ লাখ টাকা নগদ নেয়। ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করা হয় আমির হোসেন নামে এক দালালের অ্যাকাউন্টে, যিনি এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) শাখার ঘুস সংগ্রাহক হিসেবে পরিচিত। এ টাকা ভাগ হয় ডিসি, এডিসি (রাজস্ব), ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

সার্ভেয়ার আমির হোসেন স্বীকার করেছেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জেলার ডিসি অফিসে সক্রিয়। তিনি বলেন, “জমির শ্রেণিভেদে কমিশনের অঙ্ক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত মীমাংসা হয়, এর বেশি হলে সরাসরি ডিসির দালালের হাতে চলে যায়।”

প্রকল্পের পেছনের কাহিনি:
ঘটনাটি ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে। ১৬ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্যই বরাদ্দ ৮ হাজার ৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২১-২০২৬ মেয়াদে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও চার বছরে অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ।

নরসিংদী ছাড়াও এই প্রকল্পের আওতায় আরও ৬ জেলা—নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট—এর ডিসি অফিসগুলোতেও একই ধরনের ঘুস-কমিশন বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘুষ চেইনের ভেতরের চিত্র:
নরসিংদীর প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক ভূঁইয়া এই সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি ঘুসের টাকা সমন্বয় ও বণ্টনের দায়িত্বে আছেন। সার্ভেয়ার আমির হোসেন তার “দ্বিতীয় ইন কমান্ড” হিসেবে দালালদের মাধ্যমে চেক ও নগদ লেনদেন সম্পন্ন করেন।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অন্জন দাশ ও নাজমুল হাসানের নামও এই ঘুস চেইনে উঠে এসেছে। নরসিংদীর সাবেক ডিসি বদিউল আলমের আমলেই সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে ১ কোটি টাকা ঘুস নেওয়া হয়।

প্রমাণিত ব্যাংক লেনদেন:
পুবালী ব্যাংকের মাধ্যমে আমির হোসেনের নামে ৬০ লাখ টাকার চেক ইস্যু করা হয়, যা পরে আল-আরাফাহ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে। এই লেনদেনের নথিও পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ:
অন্য অনেক জমির মালিকও একইভাবে ঘুস দিতে বাধ্য হয়েছেন। যারা দিতে রাজি হননি, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া আপত্তি মামলা দিয়ে ক্ষতিপূরণ আটকে রাখা হয়েছে।
নরসিংদীর কাওছার মিয়া ও আবুল কালাম অভিযোগ করেছেন, সার্ভেয়াররা তাদের ক্ষতিপূরণের টাকার ৪০ শতাংশ কমিশন দাবি করেছেন। রাজি না হওয়ায় তাদেরকে হুমকি দেওয়া হয় যে, “কমিশন না দিলে টাকা পাওয়া যাবে না।”

সাহাবুদ্দিনের পরিবারের বক্তব্য:
সাহাবুদ্দিনের ছেলে জিএম শরীফ বলেন, “বাবা কখনো আমাদের বলেননি, তাকে ঘুস দিতে হচ্ছে। মৃত্যুর পর ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে জানলাম, আমির হোসেন নামে এক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে ৬০ লাখ টাকা গেছে। আমরা জানতে পেরেছি, তিনিই ডিসির কমিশন কালেক্টর।”

অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া:
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ডিসি বদিউল আলম বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাজমুল হাসান ও অন্জন দাশও অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে যুগান্তরের প্রতিবেদককে ঘুষের টাকা প্রস্তাব দিয়ে নিউজ বন্ধের প্রস্তাব দেন অন্জন দাশ।

প্রধান সম্পাদক: মো. নূরুল হক

যোগাযোগের ঠিকানা:

কুড়িগ্রাম অফিস: কলেজ রোড, চর রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

ঢাকা অফিস: আজরত পাড়া, মহাখালী, ঢাকা ১২১২।

ইমেইল: mofossolsangbad@gmail.com

মোবাইল: 01626605495